মহাবিশ্বের অসীম নীরবতার মাঝে আবারও প্রতিধ্বনিত হল এক নতুন বিস্ময়। বিজ্ঞানীরা এমন এক আলোর বলয় খুঁজে পেয়েছেন, যা কেবল অদ্ভুত নয় — এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী ও শক্তিশালী রেডিও রিং। এই রেডিও কাঠামো আমাদের গ্যালাক্সিরও বহু বাইরে, প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত — নাম তার RAD J131346.9+500320।
এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারটি এসেছে RAD@home Astronomy Collaboratory (India)-এর নাগরিক বিজ্ঞানীদের সহায়তায়, যারা মহাবিশ্বের গোপন অধ্যায়গুলিতে আলো ফেলছেন নতুন করে।
এই রেডিও রিংটি প্রায় ৯.৭৮ লক্ষ আলোকবর্ষ বিস্তৃত, এবং এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত দ্বিতীয় Odd Radio Circle (ORC) যাতে রয়েছে দুটি উজ্জ্বল রিং।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই রহস্যময় রিংটি আমাদের বর্তমান জ্যোতির্বিদ্যা ও গ্যালাক্সি বিবর্তন সম্পর্কিত ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ORC মূলত এক ধরনের ক্ষীণ, বলয়-আকৃতির রেডিও নির্গমন, যা কোনো গ্যালাক্সির চারপাশে ভাসমান অবস্থায় থাকে।
এগুলির আকার এত বিশাল যে, তা আমাদের Milky Way গ্যালাক্সির থেকেও প্রায় ৫০ গুণ বড় হতে পারে।
এই ধরনের অস্বাভাবিক রেডিও সার্কেল প্রথম সনাক্ত হয়েছিল মাত্র ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালে, যখন জাতীয় রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরির আনা কাপিনস্কা অস্ট্রেলিয়ান স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে পাথফাইন্ডারের ডেটা বিশ্লেষণ করছিলেন।
মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনন্দ হোতা, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, বলেছেন –
“ORC হল মহাবিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত ও সুন্দর কাঠামোর একটি। তারা আমাদের শেখায় কিভাবে গ্যালাক্সি ও কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) একসাথে বিকশিত হয়।”
আগের গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, এই বলয়গুলি হয়তো সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের শকওয়েভ বা গ্যালাক্সির সংঘর্ষজনিত শক্তি বিস্ফোরণ থেকে গঠিত।
তবে সর্বশেষ গবেষণা, যা Royal Astronomical Society-এর Monthly Notices-এ প্রকাশিত হয়েছে, বলছে — এই আলোর বলয় আসলে স্পাইরাল রেডিও গ্যালাক্সির অতিবায়ু প্রবাহের (outflow) ফল হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা উপসংহারে জানিয়েছেন, এই ORC বা রেডিও বলয়গুলি আলাদা কিছু নয় — বরং তারা ব্ল্যাক হোল জেট, গ্যালাক্টিক বাতাস ও প্লাজমা কাঠামো দ্বারা গঠিত এক বৃহত্তর মহাজাগতিক পরিবারের সদস্য।
মহাকাশের গভীরে এই আলোকবলয় যেন এক মহাজাগতিক প্রার্থনা — নিঃশব্দ অথচ পরিপূর্ণ শক্তিতে উজ্জ্বল।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্ব এখনও অনেক গোপন রহস্য ধারণ করে আছে — আর মানুষ এখনো সেই রহস্যময় সঙ্গীত শুনতে শেখার পথে।
